নন্দন হাউসফুল, ফের সিনেমার দুয়ারে দর্শক


পীযূষ আশ

এ যেন প্রথম কুড়ি ওভারে ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে স্কোরবোর্ড ঝলসে দেওয়া।

ইতিউতি সন্দেহ ছিল। কানাঘুষো ছড়াচ্ছিল, ‘লোক হবে তো’!

কোথায় কী! যাবতীয় গুজব, জল্পনা যেন রেসকোর্স, ইডেন পার করে বাউন্ডারির বাইরে।

নন্দন ‘হাউসফুল’।

ম্যাচ পকেটে। প্রথম দিনই।

আসলে গত এক বছরে করোনা ভিলেনে ‘হাউসফুল’ শব্দটিই যেন বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় ঢোকার তালে ছিল। নতুন ছবি নেই, শুটিং বন্ধ, কিংবা ছবি তৈরি হলেও পোস্ট প্রোডাকশন অনিশ্চিত। লকডাউনে হলের মুখে শাটার টানা। আনলকে খুললেও দর্শক ছিল না। তার উপর ৫০ শতাংশ অকুপেন্সির বিধি। লোক দেখবে কী, বক্স অফিসের ক্যাশবাক্সে জমাই বা পড়বে কী?

সব উত্তর দিয়ে দিল শনিবারের নন্দন চত্বর। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের দ্বিতীয় দিনে। অবশ্য, লাগাতার ছবি দেখার এটাই ছিল প্রথম দিন। কেন না, শুক্রবার ছিল শুধু উদ্বোধনী ছবি-অপুর সংসার।

শুক্রবারই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ১০০ শতাংশ আসনেই বসতে পারবেন দর্শকরা। এ দিন তাতে সাড়া দিয়ে এসেওছেন সিনেমাপ্রেমীরা। উচ্ছ্বাস নন্দনের সিইও মিত্র চট্টোপাধ্যায়ের গলাতেও, ‘নন্দন এক-এর দুপুরের শো হাউসফুল ছিল। সন্ধের কিম কি-দুকের ছবিতেও তাই। অন্য ভেনু থেকেও যা খবর পাচ্ছি, অকুপেন্সি ষাট থেকে সত্তর শতাংশ।’

ইনিংস যে লম্বা হবে, তার আভাস মিলেছিল সকাল ন’টার আগের নন্দন চত্বরেই। উইকএন্ডে সবে আড়মোড়া ভেঙে গা-ঝাড়া দিচ্ছে কলকাতা। অথচ, নন্দনের সামনে তখন থেকেই লাইন। এক হাতে ডেলিগেট আর গেস্ট কার্ড। অন্য হাতে স্মার্টফোনে ছবি দেখার ছাড়পত্র কিউ-আর-কোড। যাঁদের কোনওটাই নেই, তাঁরাও ভিড় জমাচ্ছেন এদিক-ওদিক। ‘কিফ’কর্মীদের কাছে নিচুগলায় প্রশ্ন, ‘দাদা ছবি শুরুর পর ঢোকা যাবে তো?’

কোথায় করোনাভীতি, কোথায় সংক্রমণ! এ তো নির্ভেজাল সিনেমা পার্বণের ছবি। যা বছরের পর বছর দেখে আসছে নন্দন, রবীন্দ্র সদন, শিশির মঞ্চ।

এ দিন ছবি শুরু ফেলিনির ‘এইট অ্যান্ড হাফ’ দিয়ে। বহু চর্চিত ছবি। চট করে বড় পর্দায় দেখার সুযোগ মেলে না। বেলেঘাটার স্নেহাশিস পালিত কিংবা ফিল্ম স্টাডিজের ছাত্রী নেহা গুপ্তরা গেস্ট কার্ডটি এমন আগলে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন যেন লটারিতে পাওয়া কোভ্যাক্সিন, কোভিশিল্ড। এর পর বেলা গড়িয়েছে, তুরস্কের নতুন পরিচালক হাকি ওরমানের ‘গোয়িং ব্লাইন্ড’, সাড়ে তিনটের শোয়ে ‘শামবালা’-অষ্টমীর ম্যাডক্স স্কোয়ার হয়ে উঠেছে নন্দন, রবীন্দ্র সদন। সন্ধে সাতটায় পরিচালক কিম কি দুকের ছবি। ‘হাউজফুল’ আবারও।

ফি বছর ফেস্টিভ্যালে আসেন যাঁরা, তাঁরা এক কথায় বলছেন, ভিড়ের এই তো শুরু। রহড়া থেকে দিন সাতেকের জন্য কলকাতায় বন্ধুর বাড়িতে ঠাঁই নেওয়া ক্ষীরোদ ভট্টাচার্য বলেন, ১১ তারিখ থেকে আর অনলাইন বুকিংয়েরও প্রয়োজন পড়ছে না। তখন দেখবেন ভিড় কাকে বলে।’

গত এক বছর গোটা বিশ্বেই তেমন ছবি তৈরি হয়নি। অস্কারের মতো কুলীন পুরস্কারও ছবি জমা নেওয়ার মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছে। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব এই পরিস্থিতিতেও এক ঝাঁক দেশি-বিদেশি, নতুন-পুরনো ছবির ‘প্যাকেজ’ উপহার দিচ্ছে, যা নজরকাড়া। দর্শক ফেরানোর জন্য যথার্থ।

এই মুহূর্তে রাজ্যের মানুষ মেতে ‘দুয়ারে সরকার’ নিয়ে। তাল মিলিয়ে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবও দর্শকের দরবারে ফিরিয়ে দিল সিনেমাকে।